ভাষা আন্দোলনের পটভূমি


ভাষা আন্দোলনের পটভূমি 

ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক পটভূমি


১৯৪৭ সালে হিন্দীকে ভারতের রাষ্ট্র ভাষা করার সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য জিয়াউদ্দিন আহমদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। এর প্রতিবাদে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ 'পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা' শীর্ষক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছিলেন, 'বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষা গ্রহণ করা হইলে উহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে'। তিনি আরো বলেন, 'একটি গাছ যেমন মাটি, বাতাস, আলো, সিক্ততা এবং সর্বোপরি তার নিজস্ব অঙ্কুরকে অবলম্বন করে আপন স্বভাবে বর্ধিত হয়, ভাষা-সংস্কৃতিও তেমনি একটি অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি, ইতিহাস, মনুষ্যস্বভাব এবং আকাঙ্ক্ষাকে অবলম্বন করে গড়ে ওঠে। মানুষকে কখনো তার সংস্কৃতি থেকে বিযুক্ত করা যায় না। একটি দেশে যদি একটি মাত্র সংস্কৃতি-ধারা থাকে তাহলে সে দেশটি বৈচিত্র্যহীন এবং সেই কারণে তাৎপর্যহীন একটি দেশ। মরুভূমিতে যেমন বৈচিত্র্য নেই, পৃথিবীর সব মরুভূমিই একরকম, তেমনি পাকিস্তান যদি পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল মিলিয়ে একই সংস্কৃতির ধারক-বাহক হয় তাহলে পাকিস্তান হবে বৈচিত্র্যহীন এবং সেই কারণে তাৎপর্যহীন একটি দেশ।'

লেখক সমাজ পাকিস্তানের শুরুতেই উর্দুভাষার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে সতর্ক বাণী উচ্চারণ করেছিলেন। উর্দু একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হলে পূর্ব বাংলার উপর কিরূপ অবিচার হবে এবং সাংস্কৃতিক জীবনে কিরূপ সংকটের সৃষ্টি হবে সেদিকে তাঁরা সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন এবং তাৎপর্যমণ্ডিত ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর 'তমুদ্দুন মজলিসে'র উদ্যোগে 'পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু' এই নামে একটি স্মরণিকা বের করা হয়। ঐ স্মরণিকায় আবুল মনসুর আহমদ বাংলা ভাষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের 'রাষ্ট্রভাষা' ও জাতীয় ভাষারূপে চাপিয়ে দেবার বিপদ ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত করে বলেছিলেন-'উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করিলে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ রাতারাতি অশিক্ষিত ও সরকারী চাকুরীর অযোগ্য বনিয়া যাইবেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ফার্সী জায়গায় ইংরেজীকে রাষ্ট্রভাষা করিয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ মুসলিম শিক্ষিত সমাজকে রাতারাতি অশিক্ষিত ও সরকারী কাজের অযোগ্য করিয়াছিলেন।'

১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে তমুদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনে বাংলাকে

রাষ্ট্রভাষারূপে স্বীকৃতি দানের প্রথম প্রকাশ্য দাবি তোলা হয়। 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই'- এই দাবি পর্যায়ক্রমে সার্বজনীন দাবিতে পরিণত হয়। ভাষা আন্দোলনকে সাংস্কৃতিক পর্যায়ে উত্তীর্ণ করার ক্ষেত্রে তমুদ্দুন মজলিসের প্রাথমিক প্রচেষ্টা ছিল উল্লেখযোগ্য। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে ইসলামী ভ্রাতৃসংঘের বক্তব্য ছিল খুবই তাৎপর্যমণ্ডিত। 'ইসলামী ভ্রাতৃসংঘ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, মাতৃভাষার সাহায্য ছাড়া প্রতিটি নাগরিকের দেহ ও মনের সর্বাংগীন বিকাশ সাধন করা একেবারেই অসম্ভব। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আবির্ভাবের সময় হিব্রু ভাষা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সমৃদ্ধশালী ভাষা হিসেবে পরিগণিত হতো, কিন্তু সাধারণ মানুষের বোধগম্য হওয়ার জন্যেই অপেক্ষাকৃত সহজ ভাষা আরবিতে পবিত্র কোরআন শরীফ নাজেল হয়। আরবির পরিবর্তে সেদিন যদি অন্য কোন ভাষায় কোরআন শরীফ

নাজেল হতো তবে আরববাসীদের পক্ষে ইসলামের বাণী অতি অল্প সময়ে গ্রহণ করা সম্ভব হতো না।' তাঁরা আরো বলেন বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে এক শ্রেণীর লোকের কাছে সস্তা যুক্তি।




বাংলাদেশী ভাষা আন্দোলন ১৯৫২: একটি অসামান্য এবং অননুপাতিক ঐতিহাসিক ঘটনা

ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক পটভূমি

১৯৪৭ সালে হিন্দীকে ভারতের রাষ্ট্র ভাষা ঘোষণা করার পর, আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রচারক জিয়াউদ্দিন আহমেদ উর্দুকে পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হিসেবে সাজানোর প্রস্তাবিত সাকার বেশি গুরুত্ব দেন। তার প্রতিক্রিয়ায় ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ 'পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা সমস্যা' নামক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছিলেন, 'বাংলাদেশে যদি কোর্ট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা পরিবর্তন করা হয় তবে ক্রান্তিশীলতার অপরাধীন নামাবরণ হবে'। তিনি আরও বলেন, 'যেন একটি গাছ মাটি, বাতাস, আলো, স্থিরতা এবং সর্বাধিক তার নিজস্ব অঙ্কুরটি অনুসরণ করে তানখানকিত হয়, ভাষা-সংস্কৃতিও তেমনি একটি অঞ্চলের প্রাকৃতি, ইতিহাস, মানুষের স্বভাব এবং আকাঙ্ক্ষাকে অনুসরণ করে বিকট হয় এবং উত্থিত হয়। মানুষকে কখনই তার সংস্কৃতি থেকে পৃথিবী সরাইয় না। একটি দেশে যদি কিছু একমাত্র সংস্কৃতি ধরণের থাকে তবে সে দেশ বনায়ের আদর্শহীন এবং একমাত্র কারণে প্রস্তুতিহীন একটি দেশ। মরুভূমিতে যেমন বনায়ের আদর্শ নেই, পৃথিবীর সকল মরুভূমি একরকম, তেমনি পাকিস্তান যদি পূর্ব ও পশ্চিম এলাকাগুলির অমিলিত একই ফারগুলির ধারক-চালক হয় তাহলে পাকিস্তান হবে বনায়ের আদর্শহীন এবং একমাত্র কারণে প্রস্তুতিহীন একটি দেশ।'

লেখক প্রথমেই উর্দুভাষার বিরুদ্ধে জনগণের মনোনীত এবং নজিরবিহীন আলোচনা উঠতে সহায়তা করেছিলেন। উর্দু একমাত্র জাতীয় ভাষা হলে পূর্ব বাংলার উপর কিরূপ অপততা ঘটবে এবং সাংস্কৃতিক জীবনে কিরূপ সংকট সৃষ্টি হবে সেটি তাঁদের সামাজিক প্রতিষ্ঠান করেছিলেন এবং পুর্নাঙ্গ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের ১৫ ই সেপ্টেম্বর তমুদ্দুন মজলিসের প্রস্তুতিতে 'পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা বাংলা না উর্দু' এই নামে একটি স্মৃতির পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। পুস্তিকায় আবুল মনসুর আহমদ বাংলা ভাষার বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের 'জাতীয় ভাষা' ও উর্দু ভাষারূপে আলোকপাত করে যখন তারই গগণের অবরোধ ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ঐতিহাসিক ও রাজনীতিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকাশ্য ঘটিয়ে দেন-'উর্দুর দ্বিতীয় ভাষা স্থাপনা করলে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ অবিধানশীল হবে আরও তো অসরকারী চাকুরিতের নাঙ্গভাবে অননুম যাবে। উনিশ শতবর্ষের মধ্যমে ফারসিভাষায় ইংরেজী ভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে অঙ্গীকার করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ মুসলিম সমাজকে অমারিত ও অনননুম করে ফেলেছিলেন।'

১৯৪৭ সালে অক্টোবর মাসে তমুদ্দুন মজলিসের অভিযানে প্রণোদিত ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনে বাংলাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকার করার প্রথম চেষ্টা চালু হয়। 'জাতীয় ভাষা বাংলা চাই'- এই প্রয়াসে সার্বিক সমর্থনে পরিণত হয়। ভাষা আন্দোলনকে সাংস্কৃতিক দিকে সম্মানসাদ্ধ করতে তমুদ্দুন মজলিসের প্রাথমিক প্রয়াস গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জাতীয় ভাষা বিষয়ে ইসলামী সহযোগীরা বলছিলেন, 'ইসলামী সহযোগী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, মাতৃভাষার সাহায্য ছাড়া প্রতি নাগরিকের শারীরিক এবং মানসিক সর্বমাধ্যে বিকাশ সবাইর জন্য হোক অসম্ভব। আমাদের প্রিয় নবী হয়রত মুহাম্মদ (সাহ)-এর উপস্থিতিতে হিব্রু ভাষা পৃথিবীর সেরা সমৃদ্ধশালী ভাষা হিসাবে গণিত হয়, তারপরই সাধারণ মানুষের বোধগম্য হয়রে অপেক্ষাশীলভাবে সরবিবি আরবি ভাষায় পবির কুরআন শরিফ নায়েল হয়। আরবিতে অ-্রিতি পরিবর্তিত্বে সেদিন যদি অন্য ভাষায় উভষ কুরআন শরিফ নায়েল থাকত তবে আরবি সভিদের পক্ষে ইসলামের বাছাইকالখু অতি ছামবহভ সমায় গ্রহণ করা একটি অসম্ভব হত।' তারা আরো বলেন বাংলা ভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে জীবনে কিরূপ কঠিন হয় অমেশনুযাত।"

Comments