স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস
(খ - বিভাগ)
১. বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বর্ণনা কর?
উত্তর :- ভৌগোলিক বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায়, এর আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার (বিবিএস ২০২০ অনুসারে) অথবা ১,৪৮,৪৬০ বর্গকিলোমিটার (সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক ২০২১ অনুসারে)। বাংলাদেশের পশ্চিম, উত্তর, আর পূর্ব জুড়ে রয়েছে ভারত। পশ্চিমে রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। উত্তরে, আসাম, মেঘালয় রাজ্য। পূর্বে আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম। তবে পূর্বে ভারত ছাড়াও মিয়ানমারের সাথে সীমান্ত রয়েছে। দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। বাংলাদেশের স্থল সীমান্তরেখার দৈর্ঘ্য ৪,২৪৬ কিলোমিটার। বাংলাদেশের তটরেখার দৈর্ঘ্য' ৫৮০ কিলোমিটার। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের কক্সবাজার পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতগুলোর অন্যতম।
বাংলাদেশের মাঝামাঝি স্থান দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা (২৩°৫`) অতিক্রম করেছে। বঙ্গোপসাগর উপকূলে অনেকটা অংশ জুড়ে সুন্দরবন অবস্থিত, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এখানে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল হরিন সহ নানা ধরনের প্রাণীর বাস।
বাংলাদেশের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপর ভিত্তি করে ৬টি ঋতুতে ভাগ করা হয়েছে-গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত।
বাংলাদেশে অসংখ্য পাহাড় দেখা যায়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে টারশিয়ারি যুগের পাহাড় আছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের উঁচু নিচু পাহাড় লক্ষ করা যায়। এদের উচ্চতা হাজার এর কম। বাংলাদেশে সবচেয়ে উঁচু বৃহৎ পর্বতমালা হচ্ছে তাজিংডং (বিজয়)। যার উচ্চতা ১২৩১ মিটার। বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় হচ্ছে গারো পাহাড়।
২. বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভূপ্রকৃতির প্রভাব আলোচনা কর?
উত্তর :- বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর ভূপ্রকৃতির প্রভাব অপরিসীম। অর্থনীতি, সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়সহ সবক্ষেত্রে এর প্রভাব বিদ্যমান। ভূপ্রকৃতিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কার্যকলাপ হয়ে থাকে। তবে এদেশের ভূপ্রকৃতি কৃষিনির্ভর হওয়ায় এখানকার অর্থনীতিও কৃষিকেন্দ্রিক। কৃষিকাজই অধিকাংশ মানুষের পেশা। এছাড়াও আরো বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছে।
মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রা ও কর্মকাণ্ড তার দেশের ভূপ্রকৃতি ও পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এদেশের ভূপ্রকৃতি দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে এদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন কার্যক্রম ভূপ্রকৃতির প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পরিচালিত হয়ে থাকে।
বালাদেশের ভূপ্রকৃতি তিন ধরনের। এ তিন ধরনের এলাকায় তিন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে। ভূপ্রকৃতির কারণে কোথাও জীবনযাত্রা কঠিন আবার কোথাও সহজ। যেমন- পার্বত্য অঞ্চলে জীবনযাত্রা কঠিন, আবার সমতলে সহজ প্রকৃতির। আবার কোথাও জীবনযাত্রা নিম্ন শ্রেণির, কোথাও উন্নত প্রকৃতির। ভূমির গঠন ও পার্থক্য বিবেচনা কবে বাংলাদেশের যে ৩টি ভূপ্রকৃতি লক্ষ করা যায় সেগুলো হলো,
⚫ টারশিয়ারি যুগের পাহাড় ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব: টারশিয়ারি যুগে হিমালয় পর্বত গঠিত হওয়ার সময় এ সকল পাহাড় সৃষ্টি হয়। এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণ বাঁশ, বেত জাতীয় উদ্ভিদ জন্মে। এছাড়া বৈলাম বৃক্ষ এখানে পাওয়া যায়। এ অঞ্চলে ছোটো ছোটো ঝোপজঙ্গল ও বৃক্ষরাজি বিদ্যমান। এখানকার মানুষ সাধারণত এগুলোর সাথে সম্পর্কিত হয়ে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে।
⚫ প্লাইস্টোসিন কালের পাহাড় ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব: এখানে প্রাকৃতিক গ্যাস, চুনাপাথর, কয়লা প্রভৃতি খনিজ রয়েছে যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গতীব প্রভাব বিস্তার করে। এখানে ধান, পাট, তামাক, ভুট্টা, পান উৎপন্ন হয়। কাঁঠাল ও গজারি বৃক্ষসহ নানা কৃষিজ ফসল প্রচুর জন্মে।
⚫ সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমি ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব: এ অঞ্চলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো• কুমিল্লা সমভূমি: এখানে বর্ষাকালে ডুবে থাকে এবং প্রচুর কৃষি ফসল উৎপন্ন হয়। • সিলেট সমভূমি: এ অঞ্চলে শীতকালে পানি নেমে গেলে বোবো ও ইবি ধানের চাষ হয়। এখানে হাওর রয়েছে। • সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কার্যাবলির উপর ভূপ্রকৃতির প্রভাবসমূহ পাদদেশীয় প্লাবন ভূমি এখানে ধান, পাট, ইক্ষু, তামাক জন্মে।
বাংলাদেশে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে ব্যাপক বৃষ্টিপাত ঘটায়। ফলে বাংলাদেশের কৃষির জন্য এটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। শীতকালে সামান্য বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। ফলে বাংলাদেশের প্রধান ববি শস্য এ সময়ে জন্মে থাকে।
পাহাড়ের ঢালে চা, আনারস জন্মে। মধুপুর অঞ্চল থেকে গজারি কাঠ সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। যেসব এলাকায় নদীবাহিত উর্বর পলল মৃত্তিকা রয়েছে সেখানে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, পরিবহণ জনবসতি ইত্যাদির বিশেষ উন্নতি হয়ে থাকে। এখানে সমতল ভূমি ও বহু নদনদী থাকায় সড়ক, রেল, জলপথে পরিবহণের বিশেষ উন্নতি হয়েছে।
এদেশের প্রধান ২টি সমুদ্রবন্দর ভগ্ন উপকূলের প্রভাবে তৈরি। যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের ব্যবসায় বাণিজ্যের উন্নতি ও প্রসারে ভূমিকা পালন করে থাকে।
পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর ভূপ্রকৃতির প্রভাব অপরিসীম।
৩. বাংলা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে লিখ ?
উত্তর :- বাংলা নামের উৎপত্তিতে অনেকগুলো উচ্ছের অবতারণা করা হয়। এ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে। নিচে সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলোঃ-
পৌরাণিক কাহিনীঃ প্রাচীনকালের ধর্মীয় প্রণার পুরানে বলা হয় অন্ধ মনির গর্ভে পাঁচজন সন্তান জন্মগ্রহণ করে। এর মধ্যে একজনের নাম ছিল বঙ্গ। তিনি পরাক্রমশালী রাজা ছিলেন। তার এবং তার বংশধরের থেকে পরবর্তীতে বঙ্গ নামে উৎপত্তি হয়। পরিমার্জিত হয়ে বিভিন্ন সংযোজনের মাধ্যমে এটা বাংলা নাম ধারন করে। রিয়াজ উস সালাতিন এ বলা হয়, হযরত নূহ (আ) এর এক বংশধর ছিল। তার নাম ছিল বঙ্গ। তার নাম থেকেই বঙ্গ নামের উৎপত্তি হয়। এ সকল উচ্চ থেকে বলা যায় প্রাচীনকালে হয়তো এমন কোন পরাক্রমশালী রাজা ছিল যার নাম অনুসারে বঙ্গ নামের উৎপত্তি। হয়।
চীনা ও তিব্বতি শব্দের মিলঃ বঙ্গকে অনেকে চেনা ও তিব্বতি শব্দ বলে উল্লেখ করেন। বঙ্গের অং অংশ অংশের সাথে গঙ্গা হোয়াংহো ইয়াংসিকিয়াং ইত্যাদি নদীর নামের সাথে মিল রয়েছে। বাংলায় যেহেতু অনেক জলাশয়েরও নাম রয়েছে তাই একে বঙ্গ বলা হয়। সুকুমার সেনের মতে, বঙ্গের আর একটা অর্থ হল কার্পাস তুলা। প্রাচীনকালের গ্রিক রোমান ব্যবসায়ীরা এ অঞ্চলের সুতার প্রশংসা করেছেন। পেরিপ্লাস অফ দা ইরিপ্লিইয়ান সি ইন্ডিকা ইত্যাদি গ্রন্থে এ সম্পর্কে তথ্য রয়েছে।
কৌটিল্যর অর্থশাস্ত্রঃ খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের কৌটিল্যর অর্থশাস্ত্রের বঙ্গের স্রেত স্নিগ্ধ সুতি বন্ত্রের নাম বলা হয়েছে। এটা সুকুমার সেনের মতকে সমর্থন করে। সুকুমার সেনের মতে অনেক তোলা উৎপাদন হতো বিধায় এ অঞ্চলের নাম বঙ্গ হয়েছে।
আবুল ফজলঃ মুঘল আমলে এস্রভাগ সুবা বাঙালা নামে পরিচিত ছিল। আবুল ফজল বাঙালার নামের ব্যাখ্যায় তার গ্রন্থে বলেন, বাঙালার আদি নাম ছিল বঙ্গ।
প্রাচীনকালে এখানে জলাবন্ধ হতো বলে এর রাজারা ১০ গজ উঁচু ও বিশ গজ বৃস্তিত প্রকাণ্ডে আল নির্মাণ করত। বঙ্গের সাথে আল যুক্ত হয়ে বাঙাল বা বাঙালা নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে আবুল ফজল মনে করেন।
মুঘল পূর্ব যুগে মিনহাজ ই সিরাজ মুসলমানদের বাংলা বিজয়ের সময় বাংলা নামের উল্লেখ করেননি। তিনি বরেন্দ্র, রাঢ় ও বঙ্গ নামে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল চিহ্নিত করেন। মিনহাজ পরবর্তী ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানি বাংলা নামের উল্লেখ করেন। মধ্যযুগে সুলতান ইলিয়াস সাহ সর্বপ্রথম বাংলার তিনটি প্রশাসনিক ইউনিট লক্ষনতি সাতগাঁও ও সোনারগাঁও একত্রিত করে নিজ শাসনে এনে সাহ ই বাংলা উপাধি ধারণ করেন। ঐতিহাসিক শাসন সিরাজ আফিফ তার তারিখ ই ফিরোজ শাহী গ্রন্থে ইলিয়াস শাহাকে শাহ ই বাংলা এবং তার সৈন্যদের বাংলার পাইক বলে উল্লেখ করেন।
পরবর্তীতে 16 শতক পর্তুগিজরা যখন এখানে আগমন করে তখন তারা বাংলাকে বাংলা বলে উল্লেখ করেন। পর্তুগিজ ভারণেমা বার বোমা ও জোয়াও দা ব্যাসসের বর্ণনায় ব্যাঙ্গালার উল্লেখ পাওয়া যায়।
ইংরেজরা যখন এ অঞ্চলে আসতো তখন তারা পর্তুগিজরা বেঙ্গলাকে বেঙ্গল বলে অবহিত করে। যা দেশীয়দের কাছে বাংলা বলে পরিচিত। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বেঙ্গল বা বাংলা ছিল অভিন্ন। এর পূর্বে বাংলাকে ১৯০৫ সালে ভাগ করা হলেও তা ব্যর্থ হয়। ১৯৪৭ সালে বাংলা দুই ভাগ হয়। যার একটি পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তান এবং অন্যটি পশ্চিমবঙ্গ নামে চিহ্নিত হয়।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর বিভিন্ন বৈষম্য, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুস্থান ও 1971 সালের যুদ্ধজয়ের মধ্যে দিয়ে পূর্ববঙ্গ বাংলাদেশ নাম ধারণ করে। এভাবেই বাংলা নামের উদ্ভব হয়।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলা নামের উৎপত্তিতে নানা মতামত প্রচলিত থাকলেও বঙ্গ থেকে বাংলার উৎপত্তি বলে অনেকে ঐতিহাসিক পন্ডিত মনে করেন। এ বঙ্গই প্রাচীনকালে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অস্তিত্ব ছিল। পরবর্তীতে বঙ্গের অধীনে। অনেক এলাকা আসে যা দীরে ধীরে বাংলা নাম ধারণ করে।
৪. বাঙালি সংকর জাতি - ব্যাখ্যা কর ?
উত্তর :- বাঙালি জাতির বৈশিষ্ট্য, আকৃতি, গঠন, গায়ের রং প্রভৃতির ক্ষেত্রে বহুবিধ বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। বাঙালি জাতির মধ্যে বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট। অস্টিক, দ্রাবিড়, আলপীয় জনগোষ্ঠীর সাথে আর্য, মোঙ্গল, আরব ও তুর্কিদের সংমিশ্রণে বাঙালি জাতির উদ্ভব ঘটেছে। রিজলে তার Tribes and caster of Bengal গ্রন্থে বলেন বাঙালিরা মঙ্গোল দ্রাবিড় প্রভাবিত এক সংকর জনগোষ্ঠী।
সুতরাং বলা যায়, বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সমন্বয়ে একটি সংকর জাতি হিসেবে বাঙালি জাতি পরিচিতি লাভ করেছে।

Comments
Post a Comment